গণভোট বা Referendum কি, কেন?
গণভোট বা Referendum হলো এমন একটি সরাসরি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো বিশেষ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বা সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি মতামত (হ্যাঁ বা না) নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এবং বিশ্ব ইতিহাসে গণভোটের একটি দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় ইতিহাস রয়েছে। নিচে এর প্রধান অংশগুলো তুলে ধরা হলো:
১. বিশ্ব ইতিহাসে গণভোটের সূচনা
গণভোটের ধারণাটি প্রাচীন হলেও আধুনিক বিশ্বে এর প্রয়োগ শুরু হয় মূলত ইউরোপ থেকে।
প্রাচীনকাল: প্রাচীন গ্রিসের নগররাষ্ট্রগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নাগরিকদের সরাসরি ভোট নেওয়া হতো।
আধুনিক সূচনা: ১৭৯৩ সালে ফ্রান্সে প্রথম আধুনিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাদের নতুন সংবিধান অনুমোদনের জন্য।
সুইজারল্যান্ড: গণভোটের জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত দেশ হলো সুইজারল্যান্ড। ১৮৪৮ সাল থেকে তারা নিয়মিতভাবে জাতীয় ও স্থানীয় ইস্যুতে গণভোট করে আসছে।
২. বাংলাদেশের ইতিহাসে গণভোট
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ পর্যন্ত ৩টি প্রধান গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে মজার বিষয় হলো, বর্তমানে বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের কোনো বিধান নেই।
| সাল | কার শাসনামল | উদ্দেশ্য | ফলাফল |
| ১৯৭৭ | জিয়াউর রহমান | রাষ্ট্রপতির প্রতি জনগণের আস্থা যাচাই। | ৯৮.৯% 'হ্যাঁ' ভোট। |
| ১৯৮৫ | এইচ এম এরশাদ | তাঁর সরকারের নীতি ও শাসনের প্রতি সমর্থন যাচাই। | ৯৪.১৪% 'হ্যাঁ' ভোট। |
| ১৯৯১ | অন্তর্বর্তীকালীন সরকার | রাষ্ট্রপতি শাসিত থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে পরিবর্তন। | ৮৪% 'হ্যাঁ' ভোট (সংসদীয় পদ্ধতি পাস হয়)। |
৩. বাংলাদেশের সংবিধান থেকে গণভোট বিলুপ্তি
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদে আগে গণভোটের বিধান ছিল (বিশেষ করে সংবিধানের মৌলিক কিছু পরিবর্তন করতে হলে গণভোট লাগত)। কিন্তু ২০১১ সালে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে এই বিধানটি বাতিল করা হয়। ফলে এখন সংসদ চাইলে বড় কোনো পরিবর্তন গণভোট ছাড়াই করতে পারে।
৪. বিশ্ব ইতিহাসের আলোচিত কিছু গণভোট
বিশ্ব রাজনীতিতে এমন কিছু গণভোট হয়েছে যা পুরো পৃথিবীর মানচিত্র বা অর্থনীতি বদলে দিয়েছে:
ব্রেক্সিট (Brexit, ২০১৬): ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) থেকে বের হয়ে যাবে কি না—এই গণভোটে জনগণ 'বের হয়ে যাওয়ার' পক্ষে ভোট দেয়।
দক্ষিণ সুদান (২০১১): এই গণভোটের মাধ্যমেই সুদান থেকে আলাদা হয়ে একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে দক্ষিণ সুদানের জন্ম হয়।
স্কটল্যান্ড (২০১৪): যুক্তরাজ্য থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন দেশ হবে কি না—এই ভোটে জনগণ আলাদা না হওয়ার পক্ষে রায় দেয়।
৫. কেন গণভোট নিয়ে বিতর্ক হয়?
ইতিবাচক দিক: এটি গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সরাসরি নীতি নির্ধারণে অংশ নেয়।
নেতিবাচক দিক: অনেক সময় স্বৈরশাসকরা নিজেদের ক্ষমতা বৈধ করতে গণভোটের ব্যবহার করেন (যেমনটি বাংলাদেশের ১৯৭৭ ও ১৯৮৫ সালে হয়েছিল বলে মনে করা হয়)। একে অনেক সময় 'জনমতের রাজনৈতিক ব্যবহার' বলা হয়।
Comments
Post a Comment